স্ক্রাব টাইফাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন

পোস্টটি শেয়ার করুন

স্ক্রাব টাইফাস, স্ক্রাব টাইফাস কী, স্ক্রাব টাইফাস এর লক্ষণ, স্ক্রাব টাইফাস জ্বরের কারণ, টাইফাস জ্বরের চিকিৎসা।

আপনি কি স্ক্রাব টাইফাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান।

যদি চান, তাহলে আপনি সঠিক পোস্টে এসেছেন।

আমি এই পোস্টটিতে আপনার সাথে শেয়ার করছি – স্ক্রাব টাইফাস, স্ক্রাব টাইফাস কী, স্ক্রাব টাইফাস এর লক্ষণ, স্ক্রাব টাইফাস জ্বরের কারণ, টাইফাস জ্বরের চিকিৎসা ইত্যাদি।

আশা করি স্ক্রাব টাইফাস সম্পর্কে এই পোস্টটি আপনার উপকারে আসবে।

এই পোস্টটিকে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ার অনুরোধ করছি।

স্ক্রাব টাইফাস কী

এটি একটি পতঙ্গবাহিত সংক্রামক রোগ। ‘ট্রম্বিকিউলিড’ নামে খুব ছোট একটি পোকা বা মাইট ( যার আকার মাত্র ০.২ – ০.৪ মিলিমিটার ) এর লার্ভায় ‘ ওরিয়েনসিয়া শুশুগামুসি ‘ নামের একটি জীবাণু দ্বারা স্ক্রাব টাইফাস বা টাইফাস জ্বরের সৃষ্টি হয়। 

এই নামটির উৎপত্তি হয়েছে গ্রিক শব্দ টাইফাস থেকে, যার মানে হল ধোঁয়াটে বা অস্পষ্ট। 

সাধারণত সংক্রামিত মাইটের লার্ভা কামড়ালে ওরিয়েনসিয়া শুশুগামুসি ব্যাকটেরিয়া মানুষের দেহের মধ্যে ঢুকে পড়ে টাইফাস জ্বরের সৃষ্টি করে। 

জাপানে ১৯৩০ সালে প্রথম এই ব্যাক – টেরিয়ার অস্তিত্ব ধরা পড়ে।

মূলত ঝোপঝাড়, আবর্জনা বহুল এলাকায় এই মাইটদের দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া এরা গোছো ইঁদুর, বনবিড়ালের গায়ে বাসা বাঁধে। এছাড়াও শহরের বাড়ির পোষা কুকুর – বিড়ালের গায়েও এই ক্ষুদ্র পোকা বাসা বাঁধে।

রোগের বিবরণ, আক্রান্ত তন্ত্র, রোগ আক্রমণের বয়স ও আক্রান্ত লিঙ্গ

মূলত তিন ধরনের রিকিটসিয়ী স্পেসিজের আক্রমনে এই রোগ হয়। একটানা মারাত্মক জ্বর – এমনকি রোগী মারা যেতে পারে এই রোগ থেকে। 

কঙ্কাল তন্ত্র, ফুসফুস, চর্ম, অন্তঃক্ষরণ গ্রন্থি, রক্ত, লসিকাতন্ত্র ও রোগ – প্রতিরোধ তন্ত্র এই রোগের দ্বারা আক্রান্ত হয়।

কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই, যে কোন বয়সেই এই রোগ হতে পারে।‌ 

 স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। শরীরের রোগ জীবাণু প্রবেশের ১-৩ সপ্তাহের মধ্যে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়।

স্ক্রাব টাইফাস জ্বরের কারণ

বিভিন্ন জন্ত – জানোয়ারের গায়ের পোকা বা এঁটুলি, মানুষের গায়ের উকুন প্রভৃতির মাধ্যমে এই রোগের জীবাণু ছড়ায়। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এই সৃষ্টির প্রধান কারণ।এপিডেমিক টাইফাস সচারাচর মানুষের গায়ের উকুন দ্বারা সংক্রামিত হয়। এনডেমিক টাইফাস ইঁদুরের গায়ের পোকার দ্বারা সংক্রামিত হয়।

স্ক্রাব টাইফাস জ্বরে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কাদের বেশি

শিশু ও বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম বলে এদের উপর প্রভাব বেশি পড়ে।‌

 ২০১৭ সালে কলকাতার পার্ক সার্কাস অঞ্চলের একটি হাসপাতালে একটি শিশু  টাইফাস রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। 

 ২০১৯ সালে সরকারি ও বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী ৩৮ জন এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এদের মধ্যে ৪ জন মারা গেছে। 

এই মাইট গুলো প্রধানত উওরবঙ্গের মিরিক, তরাই ও সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলেই বেশি দেখতে পাওয়া যায়। সম্প্রতি কলকাতা, হাওড়া, হুগলী, দক্ষিণ ২৪ পরগণা, মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও পশ্চিম মেদিনীপুরেও এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছে।

স্ক্রাব টাইফাস এর লক্ষণ

১। হঠাৎ খুব শীত ও কাঁপুনিসহ জ্বর আসা। প্রথমে ১০১° – ১০৩° ফারেনহাইট পরে ১০৬° পর্যন্ত জ্বর হতে পারে।

২। প্রচণ্ড ভাবে মাথার যন্ত্রনা হতে থাকে।

৩। সর্বাঙ্গের পেশীতে প্রচণ্ড ব্যাথা হয়।

৪। শরীরে সর্বদা একটি অস্বস্তি বোধ হতে থাকে।

৫। জিহ্বাতে ময়লা, কোষ্ঠকাঠিন্য, গায়ে দুর্গন্ধ প্রভৃতি হতে দেখা যায়।

এপিডেমিক টাইফাস

১। চামড়ার উপর গোলাকার শক্ত এবং খানিকটা উঁচু এবং দাগ বিশিষ্ট উদ্ভেদ বের হয়। এটি সাধারণত মধ্যদেহতেই হয়। এই উদ্ভেদ রোগাক্রমণের ৫ ম দিন থেকে হয়।

২। শুকনো কাশি হতে শুরু করে।

৩। রোগ – জীবাণু ফুসফুসকে আক্রমণ করে। ব্রঙ্কাইটিসের লক্ষণ প্রকাশ পায়।

এনডেমিক টাইফাস

১। মধ্যদেহে উদ্ভেদগুলি রোগাক্রমণের তৃতীয় দিনেই বের হয়।

২। মস্তিষ্ক আক্রান্ত হয়। মেনিনজাইটিসের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

৩। গায়ে ইঁদুরের গায়ের ন্যায় দুর্গন্ধ বের হয়।

স্ক্রাব টাইফাস এর লক্ষণ

১। কীট দংশিত স্থানে মামড়ি পড়ে।

২। সংশ্লিষ্ট স্থানে লসিকা গ্রন্থি ফোলে এবং প্রদাহিত হয়।

৩। শরীরের অন্যান্য স্থানের গ্রন্থিতে ফোলা ও ব্যাথা লক্ষ্য করা যায়।

৪। মধ্যদেহের উদ্ভেদ ৫ ম দিন হতে বের হতে শুরু করে।

৫। প্লীহা বৃদ্ধি পায়।

৬। হৃদস্পন্দন ক্ষীণ হয়।

৭। চক্ষুতে যন্ত্রনা হয়।

৮। মাইটের কামড়ের জায়গায় ৪ – ৫ মিলিমিটার মতো আকারে পুড়ে যাওয়ার মতো কালো দাগ হয়। ক্ষতের সৃষ্টি হয়। ক্ষতস্থানে জ্বালা – যন্ত্রনা হয়, ফুসকুড়ি হয়। এর সঙ্গে জ্বর, সর্দি – কাশি, মাথার যন্ত্রনা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়।

স্ক্রাব টাইফাস রোগ হঠাৎ বাড়ার কারণ

হঠাৎ বৃদ্ধির কারণ – জলবায়ুর পরিবর্তন ও নগর উন্নোয়েনের জন্যে অত্যধিক নির্মাণ শিল্পের বাড়বাড়ন্ত। প্রতিষোধক টিকা আবিস্কারের পর থেকে অনেক সংক্রামণ রোগ যেমন ডিপথোরিয়া, টিটেনাস, হুপিং কাশি, হাম, টিবি, পোলিও, স্মল পক্স, চিকেন পক্স, হেপাটাইটিস বি ও হেপাটাইটিস এ প্রভৃতি রোগের আক্রমণকে যথার্থ ভাবে আটকে দেওয়া গেছে।

আগে একটানা সংক্রামক রোগের জন্য যে পরিমাণ মৃত্যুর ঘটনা পাওয়া যেত, আজকাল আর তেমন একটা বড় দেখা যায় না। 

 বরং অসংক্রামক রোগ যেমন ব্লাড প্রেসার, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, মানসিক অসুখ, স্থূলতা, হাড়ের ক্ষয় রোগ মানুষের মধ্যে মৃত্যুর ঘটনা দিনকে দিন বেড়ে যাচ্ছে। 

 শুধুমাত্র অত্যধিক দূষণ ও প্রকৃতির খামখেয়ালি আচরণের জন্য।

গরমকালে প্রচণ্ড দাবদহ, বর্ষাকালে বৃষ্টির অভাব বা অতিবৃষ্টি ও শীতকালে শীত না পড়া – প্রকৃতির মধ্যে দারুন বিশৃঙ্খলা জনিত কারণে ছোট ছোট জীবজাত যেমন পোকা, মশা – মাছি, জীবাণু, ছত্রাক, পরজীবীদের বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে।

যা নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও জীববিজ্ঞানীরা আজ প্রচণ্ড ভাবে চিন্তিত।

তাই তো ডেঙ্গু, স্ক্রাব টাইফাস, ম্যালেরিয়া, চিকেনগুনিয়া, এনকো – ফেলাইটিস, হারপিস, চিকেন পক্স, জিকা ভাইরাস, ইবোলা, হ্যান্ড – ফুট অ্যান্ড মাউথ রোগের বাড়বাড়ন্ত। 

অধুনা ম্যালেরিয়া আক্রান্তদের সংখ্যা কম থাকলেও পতঙ্গবাহিত বিভিন্ন রোগ যেমন ডেঙ্গু, চিকেনগুনিয়া ও  টাইফাস তাড়া করে বেড়াচ্ছে মানুষকে।

আনুষঙ্গিক চিকিৎসা

১। রোগীকে অবশ্যই আলো বাতাস পূর্ণ ঘরে রাখতে হবে।

২। জ্বর অবস্থায় গরম জলে তোয়ালে ভিজিয়ে স্পঞ্জ করা ভাল এতে জ্বর কমে।

৩। জ্বর অবস্থায় এবং আক্রমণের প্রথম অবস্থায় রোগীকে প্রচুর পরিমাণে তরল খাদ্য খেতে দিতে হবে। গ্লুকোজের জল, ডাবের জল, মিছরির জল, সরবৎ, সাগু, বার্লি, ফলের রস প্রভৃতি খেতে দেওয়া ভাল।

৪। জ্বরের প্রকোপ কমে গেলে সুসিদ্ধ ভাত, মাংসের ঝোল, ডিম সিদ্ধ, দুধ, হরলিকস বা কমপ্লেন প্রভৃতি খেতে দেওয়া যাবে।

৫। রোগীকে বেশ কিছুদিন বিশ্রামে রাখতে হবে।‌ দিনে ৩ – ৪ বার মুখ ধোয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

৬। রোগীকে সুস্থ মানুষের থেকে পৃথকভাবে রাখতে হবে এবং তার ঘর সর্বদা পরিস্কার রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

স্ক্রাব টাইফাস সংক্রামক হলেও ছোঁয়াচে নয়। এই রোগের চিকিৎসার জন্য ওষুধ রয়েছে। তবে চটজলদি সনাক্তকরণ না হলে এই রোগের বাড়বাড়ন্তকে ঠেকানো যাবে না। 

 এই রোগের এখন পর্যন্ত কোনও প্রতিষোধক ভ্যাকসিন আবিস্কৃত হয় নি। রোগের লক্ষণ দেখে সন্দেহ হলে দ্রুত রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা করা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।

স্ক্রাব টাইফাস প্রতিরোধের উপায় 

টাইফাস রোগের কারণ অর্থাৎ বাহক ধ্বংস করার জন্য ধেড়ে ইঁদুর, মেঠো ইঁদুর ও মাদি ইঁদুরের উৎপাত কমানোর জন্যে লিনডেন অথবা ক্লেরডেন কীটনাশক ওষুধ স্প্রে করতে হবে। 

বিছানার চাদর, জামাকাপড়, তোষক, বালিশের ওয়াড় ইত্যাদি কেচে পরিস্কার করলে ক্ষুদ্র পোকা ও মাইটস নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া গায়ের পোকা তাড়াতে ডাই ইথাইল টলামাইড মলম ব্যবহার করা যেতে পারে।

রোগ প্রতিরোধের উপায় বাড়ি ও তার আশপাশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, ইঁদুরের বাসা যাতে তৈরি না হতে পারে সেদিকে নজর দেওয়া।

 খালি গায়ে বাচ্চাদের খোলা জায়গায় না যেতে দেওয়া।

টাইফাস রোগ হলে আতঙ্ক হওয়ার কিছু নেই যেহেতু এই রোগ নিরাময়ের টিকা যথাযথ ওষুধ রয়েছে।

আরও পড়ুন – ডেঙ্গু জ্বর 

আরও পড়ুন – চোখের রোগ সুমুহ 

উপসংহার

আশা করি আপনি এই পোস্টটি থেকে আপনার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছেন।

আপনি যে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন এই পোস্টটি থেকে তা হল – স্ক্রাব টাইফাস, স্ক্রাব টাইফাস কী, স্ক্রাব টাইফাস এর লক্ষণ, স্ক্রাব টাইফাস জ্বরের কারণ, টাইফাস জ্বরের চিকিৎসা ইত্যাদি।

আশা করি এই পোস্টটি আপনার অনেক উপকারে এসেছে।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এই পোস্টটি পড়ার জন্য।

এই পোস্টটি আপনার উপকারে আসলে শেয়ার করতে ভুলবেন না।


পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Comment